হুমায়ুন কবির
কালীগঞ্জ(ঝিনাইদহ)প্রতিনিধি:
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই লুটেরাদের বিপুল অবৈধ আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। মূলত শাস্তি না হওয়ায় লুটেরার দল আজ বেপরোয়া। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন কিছু প্রধান শিক্ষক। ওই গোষ্ঠি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাখে সাধারন শিক্ষদের উপর। এদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিকের প্রধান শিক্ষকরা সাধারন শিক্ষকের সার্ভিস বুকের ভয় দেখানোর করনে তারা কোনো প্রতিবাদ করতে পারেন না। শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ করতে শোকজ, বেতন বন্ধ, বরখাস্তের মতো পথ বেছে নেওয়া হয়। বিশেষ করে কালীগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তুচ্ছ অপরাধের কারনে শিক্ষার্থীদের বেদম প্রহার করা ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটতে দেখা যাচ্ছে, যা নিয়ে কোনো বিচার হয় না।অনেকক্ষেত্রে স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা দু’পক্ষের এক সাথে ডেকে কোনো বিচার না করে মাফ করে দেন। আবার প্রাইভেট না পড়লেও শিক্ষার্থীদের বেদম মারপিট করা হয় নানা ধরনের ছোট খাটো ভুল ত্রুটি দেখিয়ে,পরীক্ষার খাতায় নাম্বারও কম দেওয়া হয়,চাপে রাখা হয় মানসিক ভাবে।
অবৈধ ও নিম্মানের নোট গাইড পাঠ্যভুক্তির বিনিময়ে প্রকাশকদের কাছ থেকে মোটা অংকের কমিশন আদায় করে থাকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমিতির নেতৃবৃন্দ। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি এবং শিক্ষকরাও অবৈধ গাইড কোম্পানির কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে থাকেন। আর শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা চালুর পর জাল সনদে চাকরি ও ভুয়া এমপিওভুক্তি বড় ব্যবসায় পরিণত হয়। আর এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জমি-গাড়ি ক্রয়, ভবন নির্মাণ, বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কাজের
নামেও অর্থ লুটপাট চলছে। প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা দখল করে নেয়ার ঘটনাও ঘটছে। তাছাড়া অবিশ্বাস্য হারে সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহন এবং প্রতিষ্ঠানের গচ্ছিত অর্থ এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে এফডিআর করে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও বিস্তর। আর বহুদিন ধরেই অসাধু শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের জিম্মি করে কোচিং- প্রাইভেট বাধ্য করে আসছেন। আর ওই কোচিংবাজদের সুরক্ষার বিনিময়ে কমিটি ও অসাধু প্রধান শিক্ষকদের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে রাখেন । বিশেষ করে কালীগঞ্জ উপজেলায় অনেক বিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট তৈরি করে প্রাইভেট পড়ানো হয়।সচেতন অভিভাবক সমাজ এ ব্যাপারে কথা বলেও কোনো সুফল পান না। সরকারি বিদ্যালয়সমূহে প্রতি বছর বরাদ্ধ আসে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের জন্য,কিন্তু উন্নয়ন তো দুরে থাক সে সব টাকা অনেকক্ষেত্রে আত্মসাৎ করা হয় বিভিন্ন ভুয়া ভাইচারের মাধ্যমে। যা দেখার কেউ নায়।
এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারহীনতাই হচ্ছে দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় লুটপাট বাড়ার প্রধান কারণ। তদন্তে প্রায়ই বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য উদ্ঘাটিত হলও অনিয়মকারীদের কোনো শস্তি হয় না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তও হয় না। অনেক সময়ে তদন্ত আটকে যায়। আবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন দেয়ারও অভিযোগ আছে। আবার অনেক সময় তদন্ত প্রতিবেদন ফাইলবন্দিই থাকে বছরের পর বছর। আবার ত্রিপক্ষীয় বৈঠক বা আত্মপক্ষ সমর্থনের নামে কিছু প্রতিবেদন উল্টে দিয়ে অপরাধীকে মাফও করে দেয়া হয়। তাছাড়া কখনো মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিলেও পরিচালনা কমিটি না চাইলে অপরাধীর সাজা হয় না।
সরকারি প্রঞ্জাপনের নীতিমালা জারি করে অনেক দিন থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নিগ্রহ বন্ধের নানা চেষ্টা চলছে। ২০১১ সালে হাইকোর্ট শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি বেআইনি এবং অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করে। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় আবার একটি পরিপত্রও জারি করে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিপত্র অনুযায়ী নিষিদ্ধ করা শাস্তি গুলো হলো: হাত-পা বা কোনো কিছু দিয়ে আঘাত বা বেত্রাঘাত, শিক্ষার্থীর দিকে চক বা ডাস্টার-জাতীয় বস্তু ছুড়ে মারা, আছাড় দেওয়া ও চিমটি কাটা, কামড় দেওয়া, চুল টানা বা চুল কেটে দেওয়া, হাতের আঙুলের ফাঁকে পেনসিল চাপা দিয়ে মোচড় দেওয়া, ঘাড়ধাক্কা, কান টানা বা ওঠবস করানো, চেয়ার, টেবিল বা কোনো কিছুর নিচে মাথা দিয়ে দাঁড় করানো বা হাঁটু গেড়ে দাঁড় করে রাখা, রোদে দাঁড় করে বা শুইয়ে রাখা কিংবা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করানো এবং ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে এমন কোনো কাজ করানো, যা শ্রম আইনে নিষিদ্ধ।
এই পরিপত্রে শাস্তির কথাও বলা হয়েছে , শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেউ শিশুদের শারীরিক শাস্তি দিলে ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার পরিপন্থী হবে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অভিযোগের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর আওতায় অসদাচরণের অভিযোগে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।এই সবই রয়েছে খাতা-কলমে কিন্তু নিয়মের কোন বালাই নেই ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলায়।এই অবস্থা থেকে কালিগঞ্জ উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী,শিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা বেরিয়ে এসে নৈতিকতার সাথে কাজ করলেই কেবল শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকবে। কালীগঞ্জের শিক্ষার্থীরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্পদে পরিণত হবে।

