, , ,

৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম কেশবপুরের বাচ্চু রহমান

আরো খবর

এনামুল হাসান,কেশবপুর(যশোর):ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পুলিশের কনস্টেবল হওয়ার। কারণ বাবা ছিলেন আনসার সদস্য। বাবার ইউনিফর্ম, বুট আর বেল্ট নিয়ে খেলতে খেলতেই বড় হয়েছেন। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতেন একদিন পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন। তবে শুধু স্বপ্ন দেখেই ক্ষান্ত হননি, শ্রম আর অধ্যবসায়কে নিত্যসঙ্গী করে সেই স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে গেছেন তিনি।

৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় পুলিশ ক্যাডারে দেশসেরা (প্রথম) হয়েছেন যশোরের কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান বাচ্চু রহমান।

তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্যে এখন আনন্দাশ্রু ঝরছে বাবা-মায়ের চোখে, আর খুশির জোয়ার বইছে পুরো গ্রামজুড়ে।

বাচ্চু রহমানের এই পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতেই বাদ পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু হাল ছাড়েননি। এরপর ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। আর সর্বশেষ গত ২৮ জুন প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে নিজের কাঙ্ক্ষিত পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করে বাজিমাত করেন তিনি।

বাচ্চু রহমান যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার কানাইডাঙ্গা গ্রামের আনসার সদস্য নজরুল ইসলাম ও গৃহিণী বিলকিস বেগম দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে ছোট। এক সরকারি কর্মচারীর সীমিত আয়ে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে দুই সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করা ছিল এক চরম যুদ্ধ।

বাচ্চুর মা বিলকিস বেগম বলেন কত অভাব-অনটনের মধ্যে ওর বাবা ছেলেদের মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। চাকরির প্রায় সব টাকাই চলে যেত ওদের পড়াশোনায়। ছোটবেলায় বাচ্চু পড়াশোনায় অতটা মনোযোগী ছিল না। কিন্তু জেএসসি পরীক্ষার পর স্কুলের পিকনিক থেকে ফিরে হঠাৎই তার বইয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। দিন-রাত বই নিয়ে ঘর, উঠান কিংবা বাগানে পড়ে থাকত সে। অনেক সময় জোর করে বই কেড়ে নিতে হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও ও অনেক কষ্ট করেছে। সৃষ্টিকর্তা তার কষ্টের পুরস্কার দিয়েছেন।

বাচ্চু রহমান কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর ২০১৭ সালে স্থানীয় পাঁজিয়া মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাস করে ২০১৮ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে।

বিসিএস প্রস্তুতিতে বাচ্চু প্রথাগত মুখস্থবিদ্যার ওপর ভরসা করেননি। কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থী হওয়ায় যেকোনো তথ্য মুখস্থ করার চেয়ে বিষয়টি কেন ঘটছে এবং তার সমাধান কী—তা গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করতেন। বিসিএসের গৎবাঁধা গাইডের বাইরে গিয়ে নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা পড়ার অভ্যাস তাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে।

লক্ষ্য যখন মানবিক পুলিশ অফিসার হওয়া

বাচ্চু রহমান তাঁর অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই প্রথম জানতে পারি যে বিসিএসের মাধ্যমে এএসপি (সহকারী পুলিশ সুপার) হওয়া যায়। তখনই লক্ষ্য স্থির করি—আমি পুলিশ ক্যাডারেই যাব। ক্যাম্পাসজীবনে নিয়মিত পত্রিকা পড়ার সময় নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক ও সাইবার অপরাধের চিত্র দেখে খুব কষ্ট পেতাম। তখন থেকেই এগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করার প্রবল ইচ্ছা জাগে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “পদ বা পদবি নয়, আমি একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই। মানুষ বিপদে পড়লে সাধারণত ডাক্তার বা পুলিশের কাছে যায়। আমি এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই, যাতে ভুক্তভোগী মানুষ পুলিশের প্রতি পূর্ণ আস্থা ফিরে পায়।

কানাইডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুস সবুর বলেন, “ব্যর্থতার স্তূপ ডিঙিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা বাচ্চুর এই অনন্য কৃতিত্বে আজ পুরো কেশবপুরবাসী গর্বিত। বাচ্চু ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত বিনয়ী ছিল। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক কৌশল আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো বড় স্বপ্নই ছোঁয়া সম্ভব। দেশের লাখো চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীর জন্য বাচ্চু আজ এক বড় অনুপ্রেরণা।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ