ববি কুমার অধিকারী/এনসি শীল রণজিত: কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে ২৪০ বছরের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক সূর্য ঘড়ি। ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত এই অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি আজ যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আধুনিক হাতঘড়ি বা দেয়াল ঘড়ির প্রচলন ঘটার বহু আগে, যখন সূর্যের আলোর গতি পরিবর্তন দেখে সময় নির্ধারণ করা হতো, তখনকার এক জীবন্ত ও অনন্য সাক্ষী এই ঘড়িটি। অনেকের মতে রাজা প্রতাপ আদিত্য’র শাসন আমলে নির্মিত এই সূর্য ঘড়ি বা ছায়া ঘড়িটি স্থাপন করা যশোরের পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস ভবনে।
জানাযায়,বাংলাদেশে এই ধরনের সূর্য ঘড়ি মাত্র দুটি স্থানে রয়েছে, যার মধ্যে যশোরের এটিই প্রথম এবং আকারে দেশের বৃহত্তম। দ্বিতীয়টি তুলনামূলক ছোট পরিসরে ঢাকা সেনানিবাসের ‘বিজয় কেতন’ সামরিক জাদুঘরের আছে বলে জানাযায়।সূর্য ঘড়ি ভারতবর্ষে ৪ টি ও বার্মা(মায়ানমার)তে ১টি। কিন্তু সংস্কারের অভাব এবং চারপাশ দখল হয়ে যাওয়ায় যশোরের এই গৌরবময় ইতিহাস এখন ধুলোয় মিশতে বসেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঐতিহাসিক এই সূর্য ঘড়িটির স্থান সংরক্ষন না করায় ঐতিহাসিক স্থানটি দলিল লেখকদের অফিস হিসেবে ব্যবহ্রত হচ্ছে। যেখানে সূর্যের আলো পড়ে সময় নির্ধারণ হতো, সেখানে আজ সূর্যের আলো পৌঁছানোর কোনো সুযোগই নেই। পুরো ঘড়িটি ঢেকে আছে টিনের চালায়। সেখানে এখন দলিল লেখক সমিতির কম্পিউটার অপারেটররা কাজ করছেন।
ইট পাথরও চুনসুড়কির গাঁথুনি দিয়ে তৈরি ত্রিকোনমাত্রিক প্রায় ৮ ফুট লম্বা প্রধান একটি স্তম্ভ এবং এর দুই পাশে একই রূপের আরও দুটি ছোট ত্রিকোণ স্তম্ভ মিলিয়ে মোট তিনটি স্তম্ভ এখনো অরক্ষিত ভাবে টিকে আছে এবং এর গায়ে সাদা শ্বেত পাথরের খোদাই করে নির্মান শ্বৈলিন- সাল ও তারিখ লিপিবদ্ধ ছিল সেটিও কে বা কাহারা খুলে নিয়ে গেছে ।
তবে ৮ ফুট এখন নেই। মাটির নিচে ৩ ফুট হারিয়ে গেছে। স্তম্ভগুলোর গায়ে রোমান হরফে লেখা ও দাগ কাটা রয়েছে। পূর্ব প্রান্ত থেকে সূর্য উঠে পশ্চিম প্রান্তে অস্ত যাওয়া পর্যন্ত এই পিলারের গায়ে আলো-ছায়ার খেলার মাধ্যমে এক সময় নির্ধারণ করা হতো। ব্রিটিশরা এই ঘড়ির ওপর ভিত্তি করেই তৎকালীন প্রশাসনিক কাজ-কর্মের সময়সূচি ও বিচারকার্য নির্ধারণ করত।
স্থানীয়রা জানান, পূর্বে মূল স্তম্ভটির পাশে একটি বড় রেইনট্রি গাছ ছিল। এক ঝড়ে গাছটি উপড়ে স্তম্ভটির ওপর পড়লে এটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্তম্ভের ওপর থাকা গোল চাকতি আকৃতির মূল্যবান পিতলের প্লেটটি গায়েব হয়ে যায়। অথচ এটি সরকারি তত্ত্বাবধানে থাকলে এই প্রাচীন ঐতিহ্য এভাবে বিলীন হতো না।
বর্তমানে ৯০ শতাংশ মানুষই জানেন না এই প্রাচীন স্তম্ভগুলো আসলে কী। লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে যাওয়ায় এই ঐতিহ্যকে মানুষ ভুলতে বসেছে।
যশোরসহ দেশবাসীর দর্শনীয় পর্যটক স্থান হতে পারত,যা এই পুরোকৃতি হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত বা তালিকা করে সংরক্ষণের সুব্যাস্থা করা উচিত ছিল বলে মনে করেন সুধিজনেরা,
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, সূর্যঘড়ি কোনো একক ব্যক্তি আবিষ্কার করেননি।
প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালের দিকে প্রাচীন মিশরীয় বা ব্যাবিলনীয়রা প্রথম এর ব্যবহার শুরু করে। পরবর্তীতে গ্রিক ও রোমানরা এর নকশার ব্যাপক উন্নতি ঘটায়। বাংলায় রাজা প্রতাপাদিত্যের আমলে রাজবিচার কার্য পরিচালনায় সময় নির্ধারণের জন্য এই অঞ্চলে প্রথম সূর্য ঘড়ির ধারণা বা প্রাথমিক ব্যবহার শুরু হয়।
পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে, আজ থেকে প্রায় দুই শতাধিক বছর আগে যশোর কালেক্টরেটের তৎকালীন (বর্তমানে পরিত্যক্ত) রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে এই স্থায়ী সূর্য ঘড়িটি স্থাপন করা হয়।
যশোর জেলার অন্যতম প্রধান দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার মতো সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এটি এখন যশোরবাসীর চক্ষুর আড়ালে। বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে বহু জেলা প্রশাসক যশোরে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। স্থানীয় সচেতন মহল ও ইতিহাসপ্রেমীরা বিভিন্ন সময় বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আনলেও আজ পর্যন্ত এটি সংস্কার বা সংরক্ষণের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ইতিহাসবীদ ড: অধ্যাক্ষ শরীফ স্যার এই সূর্য ঘড়ি নিয়ে তার অনেক লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন সঠিক ইতিহাস। এবং উপমহাদেশের প্রখ্যাত লেখক ও ইতিহাসবীদ সতিষ চন্দ্র মিত্রের লেখা সুন্দর বনের ইতিহাস ও যশোর জেলার ইতিহাস বই থেকে এই সূর্য ঘড়ি ও রাজা প্রতাব আদিত্যের শাসন আমলের ইতিহাস উল্লেখ আছে।
যশোর শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মাহামুদ হাসান বুলু বলেন সূর্য ঘড়িটি পুনঃসংস্কার করে আবার চালু করা হলে এটি সরকারের আয়ের যোগান হিসেবে ভুমিকা রাখতে পারে বলে আমি মনে করি।
এই বিষয়ে যশোর দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হায়াতুআজিম জানান, “এটা আসলে যশোরের ঐতিহ্য এবং এটিকে দেখভাল করার দায়িত্ব আমাদেরও। দলিল লেখার কম্পিউটারের ঘরটি ভেঙে যাওয়ায় অস্থায়ীভাবে তাদেরএখানে বসানো হয়েছে। তবে অতিসত্বর এগুলো অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা হবে।”
দলিল লেখক সমিতির বর্তমান সভাপতি সরোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা ১৯৮৯ সালে দলিল লেখক সমিতির স্থাপনা করি। তার পূর্বে এখানে মানুষ মলমূত্র ত্যাগ করত।
ঐতিহাসিক স্তম্ভগুলো আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি এবং সূর্য ঘড়ির ওপরের চালাটি আমরা দ্রুতই স্থানান্তর করে দেব। এটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায় নিয়ে সঠিকভাবে দেখভাল করলে দেশবাসী ইতিহাস জানতে পারবে।”
যশোর জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব জানান, “আমরা ইতিপূর্বে গণপূর্ত বিভাগকে চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করেছি। এখন তারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে।”
যশোরের এই প্রাচীন ও গৌরবময় ইতিহাস এভাবে ধুলোয় মিশে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিশিষ্ট নাগরিকেরা।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ইতিহাসকে ধারণ করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শেকড়হীন হয়ে পড়বে। বাংলার কত ইতিহাস-ঐতিহ্য এভাবে অবহেলায় হারিয়ে গেছে। আমরা চাই না যশোরের এই অনন্য নিদর্শনটি চিরতরে বিলীন হয়ে যাক। প্রশাসনের এখনই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
ইতিহাস অনুরাগী ও স্থানীয় নাগরিকদের দাবি—অবিলম্বে এই সূর্য ঘড়িটি সংস্কার করে এর চারপাশ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হোক। একই সাথে ঘড়ির পাশে এর সঠিক ইতিহাস সম্বলিত একটি ফলক স্থাপন করা উচিত, যাতে নতুন প্রজন্ম বাংলার সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে। ঐতিহ্যের এই স্মারকটি টিকিয়ে রাখতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং স্থানীয় জেলা প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
