এনামুল হাসান, কেশবপুর (যশোর) :
যশোরের কেশবপুরে বাসবাড়িয়া খাল খননে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে খনন করা একই খালে দুই বছরের মাথায় (২০২৫-২৬ অর্থবছর) পুনরায় বরাদ্দ এনে সরকারি অর্থের সিংহভাগ হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলতে শুরু করেছে। এছাড়া খালের পাড়ে মাত্র ৫ থেকে ৩০ টাকা মূল্যের চারা গাছ রোপণ করে প্রতিটির জন্য ৫০১ টাকার ভাউচার করাসহ শ্রমিকদের মজুরি আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার (১০ আগস্ট) যশোর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে খালটি পরিদর্শনে যান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের। সরেজমিন পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, প্রাথমিক দৃষ্টিতে খাল খনন ও গাছ রোপণে কিছুটা দুর্নীতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তদন্ত শেষে অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানা যাবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে,প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি খাল খননের বাস্তবায়নে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেশবপুর উপজেলার ধর্মপুর ব্রীজ থেকে ৩.৩৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট বাসবাড়িয়া খাল খননে ৫১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮১৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ২৩ মে কাজ শুরু হয়ে ৩০ জুনের মধ্যে তা শেষ দেখায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. কামরুল ইসলামকে এ প্রকল্পের সভাপতি করা হলেও বেকুর কাজ করে ঠিকাদার মোকলেছুর রহমান মুকুল।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাব-ঠিকাদার দুটি এক্সকাভেটর দিয়ে মাত্র ৮-১০ দিন (দৈনিক ৪-৫ ঘণ্টা) কাজ চালিয়ে খালের খনন শেষ করেন। অথচ কাগজে-কলমে ৭৯৫.৩৮ ঘণ্টা কাজ দেখিয়ে ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৬৭ টাকার বিল করা হয়েছে। ঠিকাদার মুকুল জানান, উপজেলা প্রশাসন ও পিআইও অফিসের কর্তারা তাকে দুই দফায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা দিয়েছেন এবং বাকি টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের ৬ লাখ ২৪ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেখিয়ে মোট ৪৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ টাকা ব্যয় হিসেবে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় খালের দুই পাড়ে ৩০০টি বনজ ও ফলজ গাছ রোপণের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার ৪২৩ টাকা বরাদ্দ ছিল। স্থানীয়দের মতে, খালের একাংশে সামান্য কিছু গাছ লাগানো হলেও মেহেরপুর এলাকায় কোনো গাছই লাগানো হয়নি। খালের পাড়ে রোপণ করা অতি ক্ষুদ্র চারাগুলোর বাজারমূল্য ৫ থেকে ৩০ টাকা হলেও ভাউচারে প্রতিটি গাছের দাম দেখানো হয়েছে ৫০১ টাকা।
অন্যদিকে, ১১৪ জন শ্রমিকের বিপরীতে প্রতিদিন ৫০০ টাকা মজুরি দেওয়ার কথা থাকলেও শ্রমিকদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শ্রমিক জানান, মাত্র ৮-১০ দিন ৫০-৬০ জন শ্রমিককে দিয়ে কাজ করিয়ে পূর্ণ মেয়াদের ভাউচার করা হয়েছে।
সাগরদাঁড়ি ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান কাজী মোস্তাফিজুর রহমান মুক্ত জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে বিএডিসির অর্থায়নে বাসবাড়িয়া খালটি ইতোমধ্যে খনন করা হয়েছিল। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো স্থানে একবার প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে পরবর্তী ৩ বছরের মধ্যে সেখানে নতুন প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ নেই।
এই প্রকল্পের ট্যাগ অফিসার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইয়াছির আরাফাত বলেন খাল খননের কত টাকা বরাদ্দ কিছুই আমার জানা নাই। আমি শুধু মাঝে মাঝে গিয়ে শ্রমিকরা হাজি আছে কিনা সেটা দেখেছি। খাল পরিমাপের কোন তালিকায় আমাকে দেয়নি। গাছ লাগানোর বিষয়ে আমাকে কোন কিছুই জানানো হয়নি।
প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য কামরুল ইসলাম অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, “আমাকে সভাপতি করা হলেও দলীয় লোকজন কাজ করেছে।
দুই বছর আগে খনন করা হলেও ফের এ খালে বরাদ্দ আনা হয়েছিল।
তবে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলী দেবদাস বিশ্বাস। তিনি দাবি করেন, প্রকল্প অনুযায়ী কাজ শেষ হয়েছে এবং গাছে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবে আগের অর্থবছরে খালটি খনন করা হয়েছিল কিনা—তা তাঁর জানা নেই বলে জানান।
পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জড়িত সরকারি কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
